এ এক এমন দেশ, যেখানে মানচিত্রের শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা নদীগুলো পানি নয়, বরং মানুষের না বলা দীর্ঘশ্বাস বহন করে। এখানকার মহাসড়কগুলো কেবল পিচঢালা পথ নয়, ওগুলো যেন একেকটা ক্ষুধার্ত অজগর, যারা প্রতিদিন তাজা প্রাণের স্বপ্নে নিজেদের উদরপূর্তি করে। আকাশপথ এখানে মেঘের পালক নয়, বরং যান্ত্রিক ত্রুটি আর গাফিলতির এক নীল দহন। আর রেলপথ? সে তো লোহার সমান্তরাল দুই সারি হাহাকার, যা কোনোদিন একে অপরের সাথে মিলিত হয় না, শুধু মাঝখান দিয়ে বয়ে নিয়ে যায় হাজারো ছিন্নভিন্ন স্বপ্নের মিছিল।
সেদিন গোধূলির আকাশটা ছিল একদম রক্তাক্ত। সূর্য যখন ডুবছিল, তখন মনে হচ্ছিল আকাশের বুক চিরে এক ফোঁটা নীল রক্ত ঝরে পড়ছে। এই জনপদে রক্ত লাল হয় না, দীর্ঘদিনের জমানো কষ্টের মতো তা গাঢ় নীল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম কিংবা লঞ্চঘাটের পন্টুন—সবখানেই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক যুবক, তার পকেটে ছিল এক মুঠো রোদের হাসি আর বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা ছোট মেয়ের জন্য এক জোড়া কাঁচের চুড়ি। কিন্তু সেই ঘাটে বা স্টেশনে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল না। আমাদের এই ভূখণ্ডে যমদূত কোনো অদৃশ্য ছায়া হয়ে আসে না; সে আসে প্রশাসনের মরিচা ধরা শিকল আর প্রকৌশলীদের ড্রয়িং রুমের অবহেলার নকশা হয়ে।
হঠাৎ একটা বিকট শব্দ। এক পলকে সেই যুবকের স্বপ্নগুলো রঙিন প্রজাপতি হয়ে উড়ে গেল না, বরং অন্ধকারের অতল গহ্বরে পাথর হয়ে ডুবে গেল। পন্টুনের চারপাশে কেন কোনো রেলিং ছিল না? রেলগেটের সিগন্যাল কেন স্তব্ধ ছিল? মহাসড়কের বাঁকে কেন ছিল মরণফাঁদ? এই প্রশ্নগুলো যখন তার নিথর দেহটা বাতাসের কাছে করল, তখন বাতাস কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই দীর্ঘশ্বাসগুলো বাতাসের বুকে জমা হতে হতে আজ পাহাড় সমান হয়েছে।
শহরের অন্দরমহলে তখন অন্য খেলা। বড় বড় দালানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে প্রকৌশলী আর কর্মকর্তাদের টেবিলের ওপর স্তূপ করা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে আছে হাজারো মানুষের আর্তনাদ। তাদের চামড়া আজ গন্ডারের পিঠের মতো শক্ত। সেখানে সাধারণ মানুষের চোখের পানি বিঁধতে পারে না। দুর্নীতির নোনা পানি খেতে খেতে তাদের বিবেক আজ পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে। তারা সোনার হরিণ গুনতে ব্যস্ত, অথচ তাদের কলমের প্রতিটি আঁচড়ে মিশে আছে একেকটি পরিবারের কান্না। জবাবদিহিতা? সে তো রূপকথার সেই পক্ষীরাজ ঘোড়া, যার দেখা কেবল স্বপ্নলোকেই মেলে।
আকাশের মেঘেরা তখন ফিসফিস করে কথা বলছিল। তারা দেখল, প্রতিটি সরকারি দপ্তর থেকে দুর্নীতির কালো ধোঁয়া বের হয়ে দেশের মানচিত্রকে ঢেকে দিচ্ছে। সেই ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ আর সড়কের নিরাপত্তা। লোকদেখানো তদন্ত কমিটিগুলো যেন জাদুকরের টুপি, যেখান থেকে খরগোশ বের হয় ঠিকই, কিন্তু সত্য বের হয় না। দায়মুক্তির এই সংস্কৃতি যেন এক অদৃশ্য কুয়াশা, যা অপরাধীদের আড়াল করে রাখে আর নিরপরাধদের ঠেলে দেয় মৃত্যুর মুখে।
গভীর রাতে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল। দেশের প্রতিটি দুর্ঘটনাপ্রবণ মোড়ে—রেলপথে, নৌপথে, আকাশপথের নীল সীমানায়—মৃত মানুষেরা ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা ট্রাফিক সিগন্যাল দিচ্ছে না, বরং তারা প্রত্যেকে একেকটা অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই দেয়াল পার হয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন লাশ এসে যুক্ত হচ্ছে তাদের সাথে। রাষ্ট্র যখন দায়িত্ব নিতে ভুলে যায়, তখন মৃতরাই বুঝি জীবনের পাহারাদার হয়ে ফিরে আসে। তাদের চোখে পানি নেই, আছে এক অনন্ত অপেক্ষা।
মজিদ বা রহিমের সেই কাঁচের চুড়িগুলো আজ মাটির নিচে কিংবা জলের তলায় মুক্তো হয়ে গেছে। যখনই কোথাও দুর্ঘটনা ঘটে, সেই মুক্তোগুলো জ্বলে ওঠে। তারা চিৎকার করে বলে, "আর কত প্রাণ? আর কত স্বপ্ন বিসর্জন দিলে তোমাদের বোধের উদয় হবে? আর কত জীবন দিলে প্রশাসন ও রাষ্ট্র এই দায়মুক্তি থেকে রক্ষা পাবে?" কিন্তু ক্ষমতার দেয়ালগুলো আয়নার মতো স্বচ্ছ নয়, বরং পাথরের মতো বধির।
ভোরের আলো যখন ফুটল, তখন দেখা গেল আলোটা আর সাদা নয়, ওটা একদম ফ্যাকাসে হলুদ—যেমনটা হয় মরা মানুষের চোখের মণির মতো। ছোট মেয়েটি জানলায় বসে সেই নীল নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে আর পানি পড়ছিল না, কারণ সে বুঝে গেছে—এই বিচারহীনতার শহরে চোখের জলের কোনো দাম নেই। বাতাস এখন কাফনের কাপড়ের গন্ধে ভারী। এই গন্ধই আমাদের নিয়তি, এই বিষাদই আমাদের শেষ গন্তব্য।
আমরা কি তবে কেবলই যমদূতের অপেক্ষায় পন্টুনের ধারে বা রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকব? নাকি অবহেলার এই বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলার সাহস কোনোদিন আমাদের রক্তে মিশবে? এই প্রশ্নটিই আজ মানচিত্রের প্রতিটি ধূলিকণা আর জলের ঢেউয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যার উত্তর হয়তো কোনো এক জাদুকরী ভোরে পাওয়া যাবে, অথবা কোনোদিনও না।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।